Skip to main content

সন্ধ্যাসংগীত

***রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "সন্ধ্যাসংগীত" আমাদেরকে নিয়ে যায় তার কাব্যিক যাত্রার প্রথম পর্যায়ে। এই রচনাটি লেখকের শৈশব ও কৈশোরের সংযোগস্থলে অবস্থিত, যেখানে তিনি প্রথমবারের মতো নিজের সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। "সন্ধ্যাসংগীত" রচনা করার আগে, তিনি অনেক লেখার মাধ্যমে হাত পাকিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলো ছিল মূলত কপিবুকের মতো, যেখানে বাইরের মডেলের নকল প্রচেষ্টা বিদ্যমান ছিল। এই রচনায়, আমরা দেখতে পাই কিভাবে তিনি সেই কপিবুকের যুগ থেকে বেরিয়ে এসে নিজের স্বতন্ত্র কাব্যিক স্বর খুঁজে পেয়েছেন। "সন্ধ্যাসংগীত" তাঁর প্রথম স্বকীয় রূপের অভিজ্ঞান, যা তাঁকে নতুন সৃষ্টির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।


                             সন্ধ্যাসংগীত

এই গ্রন্থাবলীতে আমার কাব্যরচনার প্রথম পরিচয় নিয়ে দেখা দিয়েছে সন্ধ্যাসংগীত। তার পূর্বেও অনেক লেখা লিখেছি, কিন্তু সেগুলিকে লুপ্ত করবার চেষ্টা করেছি অপনাদরে। হাতের অক্ষর পাকাবার যে খাতা ছিল বাল্যকালে, সেগুলিকে যেমন অনাদরে রাখিনি, এও তেমনি। সেগুলি ছিল যাকে বলে কপিবুক, বাইরে থেকে মডেল লেখা নকল করবার সাধনা। থাকি বটে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার মধ্যেও নিজের স্বাভাবিক ছাঁদ একটা প্রকাশ হতে থাকে। অবশেষে পরিণতিক্রমে সেইটেই বাইরের নকল খোলসটাকে বিদীর্ণ করে স্বরূপকে প্রকাশ করে দেয়। প্রথম বয়সের কবিতাগুলি সেই রকম কপিবুকের কবিতা।

সেই কপিবুক যুগের চৌকাঠ পেরিয়েই প্রথম দেখা দিল সন্ধ্যাসংগীত। তাকে আমের বোলের সঙ্গে তুলনা করব না, করব কচি আমের গুটির সঙ্গে, অর্থাৎ তাতে তার আপন চেহারাটা সবে দেখা দিয়েছে শ্যামল রঙে। রস ধরে নি, তাই তার দাম কম। কিন্তু সেই কবিতাই প্রথম স্বকীয় রূপ দেখিয়ে আমাকে আনন্দ দিয়েছিল। অতএব সন্ধ্যাসংগীত-ই আমার কাব্যের প্রথম পরিচয়। সে উৎকৃষ্ট নয়, কিন্তু আমারই বটে। সে সময়কার অন্য সমস্ত কবিতা থেকে আপন ছন্দের বিশেষ সাজ পরে এসেছিল। সে সাজ বাজারে চলিত ছিল না।


***"সন্ধ্যাসংগীত" হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যিক যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যদিও এটি তার পরিণত কাব্যের তুলনায় কম রসযুক্ত, তবুও এই রচনাটি তার স্বতন্ত্র কাব্যিক রূপের প্রথম প্রকাশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কপিবুকের যুগের অনুকরণের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে, তিনি "সন্ধ্যাসংগীত" এর মাধ্যমে নিজের কাব্যিক সত্তার প্রথম পরিচয় দেন। এই রচনা তাঁর প্রথম কাব্যিক আনন্দের উৎস, যা পরবর্তীতে তাঁর অমর সাহিত্যকর্মের ভিত্তি স্থাপন করে। "সন্ধ্যাসংগীত" এর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ আমাদের দেখান কিভাবে একজন লেখক তার নিজস্ব ধ্বনিতে, ছন্দে ও রূপে নতুন সৃষ্টির পথে এগিয়ে যেতে পারে।

Comments

Popular posts from this blog

ছবি ও গান

***রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা "ছবি ও গান" আমাদের নিয়ে যায় সেই সময়ে, যখন শৈশব ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে একজন তরুণ লেখক নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে। বয়ঃসন্ধির সেই সংকটময় মুহূর্তে, যেখানে ছেলেমানুষি ভাষা ও কৈশোরের ভাব মিলে মিশে যায়, সেখানে লেখকের মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা ও সৃজনশীলতার সন্ধান মেলে। এই রচনা কেবল সুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রূপের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ার কাহিনী বলে। এই কাহিনী আমাদের সামনে তুলে ধরে লেখকের প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃষ্টিশীলতার হাতেখড়ি, যা পরবর্তীকালে তার সাহিত্যিক জীবনের ভিত্তি স্থাপন করে। "ছবি ও গান" সেই সৃষ্টিশীল যাত্রার প্রাথমিক পদক্ষেপ, যেখানে তার ভাষা ও ভাবনা প্রথম মূর্ত হয়ে ওঠে।                             ছবি ও গান ছবি ও গান নিয়ে আমার বলবার কথাটা বলে নিই। এটা বয়ঃসন্ধিকালের লেখা, শৈশব যৌবন যখন সবে মিলছে। ভাষায় আছে ছেলেমানুষি, ভাবে এসেছে কৈশোর। তার পূর্বেকার অবস্থায় একটা বেদনা ছিল অনুদ্দিষ্ট। সে যেন প্রলাপ বকে আপনাকে শাস্ত করতে চেয়েছে। এখন সেই বয়স যখন কামনা কেবল সুর খুঁজছে না, রূপ...

A Short Story "A Cosmopolite in a Café" by O. Henry.

  In the bustling ambiance of a café , amidst the clinking of glasses and the hum of conversation, unfolds a tale of worldly wisdom and cultural exchange. O. Henry's "A Cosmopolite in a Café" delves into the life of a true citizen of the world, whose experiences and perspectives transcend geographical boundaries. Set against the backdrop of a vibrant café scene, this story explores the universal themes of human connection and the richness of diversity. Join us as we journey through the insightful musings of a cosmopolite, navigating through the complexities of life with wit and charm.                A Cosmopolite in a Café A T MIDNIGHT THE CAFÉ was crowded. By some chance, the little table at which I sat had escaped the eye of incomers, and two vacant chairs at it extended their arms with venal hospitality to the influx of patrons. And then a cosmopolite sat in one of them, and I was glad, for I held the theory that since Adam, no true citi...

ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী

***রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্মৃতিকথায় নিজের সাহিত্যিক জীবনের প্রথম দিকের কিছু স্মরণীয় ঘটনা তুলে ধরেছেন, যা তাঁর কিশোরবেলার সাহিত্যচর্চা ও বৈষ্ণব পদাবলীর প্রতি তাঁর আগ্রহের কাহিনী বর্ণনা করে। অক্ষয়চন্দ্র সরকারের নেতৃত্বে বৈষ্ণব পদাবলী প্রকাশের সময়, রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল খুবই অল্প। সেই সময়ে তাঁর অন্তর্নিহিত কৌতূহল ও শব্দতত্বের প্রতি প্রাকৃতিক আকর্ষণই তাঁকে বৈষ্ণব পদাবলীর প্রতি আগ্রহী করে তোলে। পরিবারের মধ্যে একমাত্র পাঠক হওয়ার সুবাদে তিনি পদাবলীর ব্রজবুলি ভাষার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন এবং শব্দের অর্থ অনুসন্ধান করতে থাকেন। পরবর্তীতে কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ তাঁর লেখা ব্যবহার করেন, যা রবীন্দ্রনাথের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। এই স্মৃতিচারণা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক যাত্রার প্রাথমিক দিকের চ্যালেঞ্জ এবং সাফল্যের প্রতিফলন।                     ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী অক্ষয়চন্দ্র সরকার মহাশয় পর্যায়ক্রমে বৈষ্ণব পদাবলী প্রকাশের কাজে যখন নিযুক্ত হয়েছিলেন, আমার বয়স তখন যথেষ্ট অল্প। সময়নির্ণয় সন্বন্ধে আমার স্বাভাবিক অন্যমনস্ক...